দিন যতই সামনে এগিয়ে যাচ্ছে, আমাদের অন্তরে এক বিশেষ রূহানী অনুভূতি জাগতে শুরু করেছে। রমযান এগিয়ে আসছে ইনশা’আল্লাহ, আর ১৬ ফেব্রুয়ারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে আল্লাহর সবচেয়ে বরকতময় মাস আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে। এটি শুধু ক্ষুধা-পিপাসার নাম নয়; বরং রহমত, মাগফিরাত, জাহান্নাম থেকে নাজাত এবং আত্মশুদ্ধির মৌসুম।
প্রশ্ন হলো: আমরা কি সত্যিই রমযানকে স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুত?
যেমন আমরা সম্মানিত মেহমানের আগমনের আগে ঘর প্রস্তুত করি, তেমনি রমযানের জন্য আমাদের হৃদয়, আমল ও নিয়ত প্রস্তুত করতে হবে।
🌙 রমযানের ফযিলত ও বরকত
রমযান উম্মতে মুহাম্মদী ﷺ-এর জন্য আল্লাহর বিশেষ উপহার। এই মাসে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং নেক আমলের সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।
১. কুরআনের মাস
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“রমযান মাস—যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানবজাতির জন্য হিদায়াত এবং সৎপথের স্পষ্ট প্রমাণ।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)
এই মাস কুরআনের সাথে সম্পর্ক মজবুত করার শ্রেষ্ঠ সময়—তিলাওয়াত, অনুবাদ ও চিন্তাভাবনার মাধ্যমে।
২. নেক আমলের বহুগুণ সওয়াব
-
নফল = ফরজের সমান
-
ফরজ = ৭০ গুণ বা তারও বেশি
অতএব এটি সওয়াব অর্জনের সুবর্ণ সুযোগ।
৩. গুনাহ মাফের মাস
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমযানের রোজা রাখে, তার পূর্বের গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”
(বুখারী, মুসলিম)
এটি এক সম্পূর্ণ আত্মিক নবজাগরণ।
৪. জাহান্নাম থেকে মুক্তি
রোজা জাহান্নামের আগুন থেকে ঢালস্বরূপ। প্রতিদিন ইফতারের সময় বহু বান্দাকে মুক্তি দেওয়া হয়।
৫. লাইলাতুল কদর
রমযানের এক রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম—৮৩ বছরের বেশি ইবাদতের সওয়াব।
📖 কুরআনের আলোকে রোজা
আল্লাহ বলেন:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর করা হয়েছিল—যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন কর।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৩)
রমযানের মূল লক্ষ্য তাকওয়া।
রমযান আমাদের শেখায়:
-
সবর
-
নফস নিয়ন্ত্রণ
-
কৃতজ্ঞতা
-
দরিদ্রের অনুভূতি
-
দুনিয়া থেকে বিমুখতা
🕋 হাদিসের আলোকে রমযান
জান্নাতের দরজা খুলে যায়
রাসূল ﷺ বলেছেন:
“রমযান এলে জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলিত করা হয়।”
(বুখারী)
রোজাদারের মুখের গন্ধ
“রোজাদারের মুখের গন্ধ আল্লাহর নিকট মেশকের সুগন্ধির চেয়েও প্রিয়।”
(মুসলিম)
ইফতারের দোয়া কবুল
“রোজাদারের দোয়া ইফতারের সময় প্রত্যাখ্যাত হয় না।”
(তিরমিযী)
🕌 সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কীভাবে প্রস্তুতি নিতেন?
সাহাবাগণ রমযানের মর্যাদা গভীরভাবে উপলব্ধি করতেন। তাদের প্রস্তুতি মাসের পর মাস আগে শুরু হতো।
১. ছয় মাস আগে দোয়া
তারা দোয়া করতেন:
“হে আল্লাহ! আমাদের রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।”
আর পরের ছয় মাস কবুলিয়াতের দোয়া করতেন।
২. কুরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি
রমযানে তারা দুনিয়াবি কাজ কমিয়ে কুরআনে মশগুল থাকতেন। বহু খতম দিতেন।
৩. শাবানে নফল রোজা
রমযানের প্রস্তুতিতে শাবান মাসে অধিক রোজা রাখতেন।
৪. সদকা ও দান
গরিবদের সাহায্য বাড়িয়ে দিতেন।
৫. হৃদয়ের পরিশুদ্ধি
ঝগড়া মিটাতেন, ক্ষমা করতেন, সম্পর্ক ঠিক করতেন।
🌟 আমরা কীভাবে প্রস্তুতি নেব?
১. হৃদয়ের প্রস্তুতি
-
তওবা
-
হিংসা দূর
-
মানুষকে ক্ষমা
২. সালাত ঠিক করা
-
পাঁচ ওয়াক্ত
-
সুন্নাহ
-
তারাবির নিয়ত
৩. কুরআনের সাথে সম্পর্ক
-
দৈনিক তিলাওয়াত
-
অনুবাদ
-
তাফসির
৪. রোজার অভ্যাস
-
সোমবার, বৃহস্পতিবার
-
আইয়ামে বীজ
৫. জিহ্বা ও দৃষ্টি সংযম
বর্জন করুন:
-
গীবত
-
মিথ্যা
-
অশ্লীল কনটেন্ট
-
সময় অপচয়
৬. রমযান পরিকল্পনা
-
খতম লক্ষ্য
-
দান পরিকল্পনা
-
দোয়ার তালিকা
-
লাইলাতুল কদর ইবাদত
🕯️ রমযান প্রস্তুতি চেকলিস্ট
✔ তওবা
✔ নামাজ ঠিক
✔ কুরআন লক্ষ্য
✔ সদকা
✔ অন্তর পরিষ্কার
✔ সোশ্যাল মিডিয়া কম
✔ দোয়া মুখস্থ
🌙 একটি চিন্তার বিষয়
গত রমযান আমরা অনেক প্রিয়জনের সাথে কাটিয়েছি…
আজ তাদের কেউ কেউ কবরবাসী।
আমরা জানি না:
আমরা কি পরের রমযান পাব?
যদি আল্লাহ পৌঁছে দেন—এটি তাঁর বিশেষ রহমত।
🤲 সমাপনী দোয়া
“হে আল্লাহ! আমাদের রজব ও শাবানে বরকত দিন এবং আমাদের রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।”
আর যখন রমযান আসে:
“হে আল্লাহ! আমাদের রোজা, কিয়াম, তিলাওয়াতের তাওফিক দিন এবং কবুল করুন।”
📌 উপসংহার
১৬ ফেব্রুয়ারি আমাদের জাগিয়ে দিচ্ছে—
রমযান এগিয়ে আসছে ইনশা’আল্লাহ।
তাকে স্বাগত জানাই:
-
তওবা দিয়ে
-
কুরআন দিয়ে
-
নামাজ দিয়ে
-
সদকা দিয়ে
-
ইখলাস দিয়ে
যদি আমরা হৃদয় প্রস্তুত করি—রমযান আমাদের জীবন বদলে দেবে।
আল্লাহ আমাদের রমযান পর্যন্ত পৌঁছে দিন, উপকৃত হওয়ার তাওফিক দিন এবং মাগফিরাত দান করুন। আমীন। 🌙

