রমজান দিবস ৭ — রমজানে কুরআন তিলাওয়াতের ফজিলত

আমরা যখন রমজানের ৭ম দিনে পৌঁছাই, তখন রোজা, সালাত, তারাবীহ ও ইবাদতের রূহানিয়াত আমাদের জীবনকে ঘিরে ফেলতে শুরু করে। শরীর রোজার সাথে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং হৃদয় আল্লাহর স্মরণে আরও নরম ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এই সময়টিই হলো রমজানের সবচেয়ে বড় নিয়ামত — পবিত্র কুরআন — এর সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করার উপযুক্ত মুহূর্ত।

রমজান ও কুরআনের সম্পর্ক সাধারণ নয়; এটি ঐতিহাসিক, আধ্যাত্মিক এবং হিদায়াতপূর্ণ।


১️⃣ কুরআন নাযিল হয়েছে রমজান মাসে

কুরআন তিলাওয়াতের বিশেষ ফজিলতের প্রথম ও প্রধান কারণ হলো — কুরআন এই বরকতময় রমজান মাসেই নাযিল হয়েছে

আল্লাহ তাআলা বলেন:

“রমজান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত এবং সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)

এই আয়াত প্রমাণ করে:

  • রমজান শুধু রোজার মাস নয়

  • এটি নুযূলুল কুরআনের মাস

  • মানবজাতির হিদায়াতের সূচনা এই মাসে

প্রথম ওহী নাযিল হয় গারে হিরায়, ফেরেশতা জিবরাইল (আ.) এর মাধ্যমে।

তাই:

  • রমজান = কুরআনের মাস

  • তিলাওয়াত = নুযূলের স্মৃতি পুনর্জাগরণ

  • প্রতিটি অক্ষর = ওহীর সাথে সংযোগ

সালাফে সালিহীনগণ রমজানে বহুবার কুরআন খতম করতেন।


২️⃣ রমজানে সওয়াব বহু গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়

রমজানের আরেকটি মহান ফজিলত হলো — নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়

হাদিসে এসেছে:

“যে ব্যক্তি রমজানে একটি নফল নেক কাজ করে, সে অন্য মাসে একটি ফরজ আদায়ের সমান সওয়াব পায়। আর যে একটি ফরজ আদায় করে, সে সত্তর ফরজের সমান সওয়াব পায়।”
(বায়হাকি — শু‘আবুল ঈমান)

অর্থাৎ:

  • নফল = ফরজের সওয়াব

  • ফরজ = ৭০ ফরজের সওয়াব (বা তারও বেশি)

এখন চিন্তা করুন — যখন সব আমলের সওয়াব এত বাড়ে, তখন কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব কত বেশি হবে!

আরেক হাদিসে:

“যে কুরআনের একটি অক্ষর পাঠ করে, তার জন্য একটি নেকি, আর প্রতিটি নেকি দশগুণ বৃদ্ধি করা হয়…”
(তিরমিযি)

হিসাব করুন:

  • ১ অক্ষর = ১০ নেকি

  • রমজানে = বহুগুণ বৃদ্ধি

  • ১ পৃষ্ঠা = হাজারো নেকি

  • ১ খতম = অগণিত সওয়াব


৩️⃣ অর্থ না বুঝেও তিলাওয়াত — তবু সওয়াব আছে

✔️ অর্থ না বুঝে পড়লেও সওয়াব

অনেকেই ভাবেন — “আরবি বুঝি না, তাহলে পড়ে লাভ কী?”

উলামায়ে কেরাম বলেন:

  • তিলাওয়াত নিজেই ইবাদত

  • জিহ্বা কুরআনে ব্যস্ত থাকা সওয়াবের কাজ

  • হৃদয়ে নূর নাযিল হয়

তাই অর্থ না বুঝলেও তিলাওয়াত ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়।


✔️ অর্থ বুঝে পড়া আরও উত্তম

সাথে সাথে কুরআনের অনুবাদ ও তাফসির পড়াও অত্যন্ত জরুরি।

আল্লাহ বলেন:

“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমরা নাযিল করেছি যাতে মানুষ এর আয়াতসমূহ নিয়ে চিন্তা করে।”
(সূরা সাদ ৩৮:২৯)

ফলাফল:

  • তাদাব্বুর (গভীর চিন্তা) সৃষ্টি হয়

  • হিদায়াত লাভ হয়

  • জীবন পরিবর্তিত হয়

সেরা পদ্ধতি:

  • অন্তত ১ খতম আরবিতে

  • প্রতিদিন কিছু অনুবাদ

  • অল্প আয়াত তাফসিরসহ


৪️⃣ কুরআন কিয়ামতের দিন সাক্ষ্য দেবে

সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ফজিলত — কুরআন তার পাঠকের পক্ষে শাফাআত (সুপারিশ) করবে।

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“কুরআন তিলাওয়াত করো, কারণ এটি কিয়ামতের দিন তার পাঠকদের জন্য সুপারিশকারী হয়ে আসবে।”
(সহিহ মুসলিম)

কল্পনা করুন:

  • কেউ কারো উপকারে আসবে না

  • মানুষ নিজ নিজ চিন্তায় ব্যস্ত

  • আমলনামা ওজন হবে

সেই সময় কুরআন বলবে:

“হে আল্লাহ, সে আমাকে তিলাওয়াত করত — তার জন্য আমার সুপারিশ কবুল করুন।”

হাদিসে এসেছে — সূরা বাকারা ও আলে ইমরান মেঘের ছায়ার মতো হয়ে আসবে।


৫️⃣ জান্নাতে মর্যাদা বৃদ্ধি করবে

রাসূল ﷺ বলেছেন:

“কুরআনের সাথীকে বলা হবে — পড়তে থাকো এবং উঠতে থাকো; তোমার মর্যাদা হবে শেষ আয়াত পর্যন্ত।”
(আবু দাউদ, তিরমিযি)

অর্থাৎ:

  • বেশি তিলাওয়াত = বেশি মর্যাদা

  • বেশি হিফজ = বেশি উচ্চতা

  • রমজানের তিলাওয়াত = চিরস্থায়ী লাভ


৬️⃣ রমজানে নবী ﷺ এর আমল

নবী করিম ﷺ রমজানে তিলাওয়াত বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেন।

হাদিসে:

  • জিবরাইল (আ.) প্রতি রমজানে আসতেন

  • পূর্ণ কুরআন পর্যালোচনা করতেন

  • শেষ বছরে দুইবার

শিক্ষা:

  • রমজান = কুরআন রিভিশন মাস

  • তিলাওয়াত বাড়াও

  • মনোযোগ দিয়ে শোনাও সওয়াব


৭️⃣ তিলাওয়াতের রূহানী প্রভাব

✨ হৃদয় নরম হয়
✨ ঈমান মজবুত হয়
✨ মানসিক শান্তি আসে
✨ গুনাহ থেকে রক্ষা পায়

আল্লাহ বলেন:

“আল্লাহর স্মরণেই অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।” (১৩:২৮)


৮️⃣ দিবস ৭ থেকে বাস্তব আমল পরিকল্পনা

  • প্রতিদিন ১ জুয = ১ খতম

  • নামাজের পর ৪ পৃষ্ঠা

  • তারাবীতে শ্রবণ

  • ফজরের পর তিলাওয়াত

  • আসরের পর অনুবাদ

ধারাবাহিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।


উপসংহার

সংক্ষেপে:

  • কুরআন রমজানে নাযিল হয়েছে

  • সওয়াব ৭০ গুণ বা তারও বেশি বাড়ে

  • অর্থ না বুঝেও তিলাওয়াত সওয়াবের

  • অর্থ বুঝে পড়া হিদায়াতের

  • কুরআন কিয়ামতে সুপারিশ করবে

  • জান্নাতে মর্যাদা বাড়াবে

  • নবী ﷺ এর সুন্নত — রমজানে বেশি তিলাওয়াত

তাই রমজানের ৭ম দিনে নতুন অঙ্গীকার করি:

প্রতিদিন পড়বো — বুঝবো — আমল করবো।

কারণ কুরআন শুধু তিলাওয়াতের কিতাব নয়…
এটি জীবন চলার পথনির্দেশ, নূরের উৎস,
এবং আখিরাতে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্গী।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।